এই ব্লগটা পড়লে যে কেউই আমাকে ছেলে মানুষ বলবে। কিন্তু আবেগের কাছে মানুষের কথা হার মানে স্বাভাবিকভাবেই। ১৩ বছর পেরিয়ে গিয়েছে ঘটনার কিন্তু তাও অদ্যাবধি আমি ঘটনাটা ভুলতে পারিনা বা কষ্ট আমি মনের গভীর থেকে মুছে ফেলতে পারিনি। এবার চলে যাই মূল কথায়।


এ পর্যন্ত আমরা ৯ বার গাড়ী পাল্টিয়েছি। আমার আব্বু ১৯৯৫ সালের আগে “একুয়া কন্সাল্ট্যান্ট” এ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করত। তখন সেই অফিস থেকে আব্বুকে প্রথমে টয়োটা লাইটেস এবং পরে টয়োটা পাবলিকা গাড়ী ফুলটাইম গাড়ী হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে আব্বু একুয়া ছেড়ে ডানিডা তে জয়েন করে, তখন আব্বুকে একুয়ার দেওয়া গাড়ী ফেরত দিয়ে দিতে হয়। আমি তখন কেবল স্কুল এ ভর্তি হয়েছি নার্সারি তে। আমার ছোটবেলা থেকেই গাড়ির প্রতি অন্যরকম একটা আকর্ষন ছিল। তাই আব্বু ডানিডা তে জয়েন করার পর থেকেই বায়না ধরতাম নতুন গাড়ি কেনার জন্য। এরপর ১৯৯৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর আমরা নিশান সানি গাড়িটি কিনি। গাড়িটা পছন্দ হয় আমার। এভাবে মোটামুটি ৫ বছর কেটে যায়। 


২০০০ সালে ডানিডা থেকে আব্বুকে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়ী দেওয়া হয়। তখন, সেই গাড়ীটাই বেশি ব্যবহৃত হত। নিশান সানিটা বেশিরভাগ সময়ই পড়ে থাকত আমাদের এপার্টমেন্টের পার্কিং এরিয়াতে। আর তখন বাসার প্রায় সবাই নিশান সানির চেয়ে প্রাডোতে চড়তেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। এমনি করে একদিন আব্বু বলে যে নিশান সানি বেচে দিবে। একথা শুনে আমার প্রচন্ড মন খারাপ হয়ে যায়। এমনকি আমি কেঁদেছিও একা একা। কিন্তু আমি নাছোরবান্দা ছিলাম। গাড়ি আমি বেচতে দিবনা। কিছুদিন এই নিয়ে জেদ করার পর অবশেষে আমার কথা ধোপে টিকে যায়। নিশান সানি থেকে যায় আমাদের সাথে। এখানে একটা কথা বলে রাখি, অফিস থেকে পাওয়া প্রাডো গাড়ি তখন বেশি ব্যবহার করলেও আমরা যখন দেশের বাড়িতে বা ঢাকার বাইরে যেতাম, তখন নিশান সানিই নিয়ে যেতাম।


৬ বছর পেরিয়ে যায়। ২০০৬ এর জুন মাসে ডানিডা থেকে পাওয়া প্রাডো গাড়িটি দিয়ে দিতে হয় পুনরায়। তখন আবার নিয়মিতভাবে নিশান সানি ব্যবহার করা শুরু করি আমরা। আমি প্রাডোর চেয়ে নিশান এ চড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। নিশান সানি গাড়িটি কেনার সময়ে গাড়ির রঙ ছিল সাদা। পরে ২০০৬ এ আমরা নতুন করে গাড়িটি রঙ করি এবং অনেকটা নীলাভ ধূসর রঙ করি। তখন, গাড়িটি দেখতে আরও সুন্দর হয়ে যায়। এর ১ বছর পরে ২০০৭ সালে আব্বু একটা এসইউভি(আমরা যেটাকে জীপ বলি) কেনার ইচ্ছা পোষণ করে। কিন্তু, নিশান সানি গাড়িটি আমার পছন্দ ছিল বলে আব্বু বলে যে নিশানটাও থাকবে। আমি এতে খুশী হই। কিন্তু আম্মু চাচ্ছিলনা দুটো গাড়ি থাকুক। সেক্ষেত্রে আব্বুর হাতে দুইটা পথ খোলা থাকে। একটা হল হয় নিশান সানিই রেখে দেওয়া, অথবা আরেকটি হল নিশান সানি বেচে নতুন জিপ কেনা। আমার মনে হয়েছিল যে আব্বুর জিপ চালানোর একটা শখ আছে কিন্তু আম্মু এদিকে দুইটা গাড়ি রাখতে দিবেনা। এত কিছু চিন্তা করে আমি আব্বুর ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দিলাম। তখন আমি বললাম নিশান সানি বেচে দিতে। অথচ আমি এই গাড়িটা যাতে না বেচে, আমি সেইজন্য কান্নাকাটি করেছিলাম একসময়ে।  আমি চেয়েছি আব্বুর ইচ্ছাকে বড় করে দেখতে। আমি রাজি হলাম। ২০০৮ এর জানুয়ারি তে ৭ম গাড়ি হিসেবে হোন্ডা সি আরভি জিপ কেনা হয় এবং নিশান সানি বেচার জন্য ক্রেতা খোজা হয়। আব্বু যখন ডানিডা তে চাকরি করত, তখন আব্বু কে যেই প্রাডো গাড়িটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা চালাতেন মাসুদ নামের একজন ড্রাইভার। উনি যখন শুনল যে আমরা নিশান সানি বেচব, তখন উনি আগ্রহী হয় গাড়ীটা কেনার জন্য কারন সে তা দিয়ে ভাড়া খাটাবে। আব্বু রাজী হয়। আমরা তার কাছে বেচে দেই গাড়ি। ৮৯ মডেলের গাড়ি হলেও ২০০৮ সালের জানুয়ারী তে আমরা মোটামুটি ভাল দামেই আমরা নিশান সানি বিক্রি করি। দিন যায়। এইভাবে করে একদিন চলে আসে সেই দিন। ৭ ডিসেম্বর ২০০৮!!!!

ছবিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন তোলা, যেদিন আমরা নোয়াখালী থেকে ঢাকায় চলে আসি আব্বুর ঢাকায় বদলি হওয়ার পর। গাড়িটির রঙ তখন সাদা ছিল 

মাসুদ সাহেব একজন কে নিশান সানি ভাড়া দেয় দিনাজপুরের জন্য। সকালে সেই লোক নিশান সানি নিয়ে রওনা দেয় দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে। বগুড়া পর্যন্ত ঠিক মতই গেল। কিন্তু এরপর…………

একটা বাস এসে সজোরে নিশান সানিকে ধাক্কা মারে। মুহুর্তেই দুমড়ে মুচড়ে যায় গাড়িটি। আমাদের কাছে গাড়িটি ১৩ বছর(১৯৯৫-২০০৮) ছিল । একটা আচড়ও পড়েনি তখন গাড়িতে আর আমরা গাড়িটি বিক্রি করার ১ বছর যেতে না যেতেই গাড়িটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে গেল। আমি দুইটা জিনিস নিয়ন্ত্রন করতে পারিনা। একটা হল আবেগ আরেকটা হল রাগ। আমি ঘটনা শোনার পর আবেগ নিয়ন্ত্রন এ রাখতে পারিনি। আমি আজও অনেক কষ্ট পাই গাড়িটার জন্য। 


উক্ত এই ঘটনাটি আমাকে ভেহিকেল সেফটি সিস্টেম নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে এবং বর্তমানে নিজেকে সেভাবে তৈরি করছি আমি। 

নিশান সানির জন্য আজো খারাপ লাগে। আমি কেন রাজি হলাম তখন গাড়িটা বেচার জন্য? গাড়িটা না বেচলে হয়তো এই পরিনতি হতনা। বিদেশে সবারই দুইটা বা একাধিক গাড়ি থাকে, আমরাও যদি সেই আইডিওলজি মেনে চলতাম, হয়তো গাড়িটা বেঁচে যেত। যাই হোক, আমি শেষ করছি, সবাই ভাল থাকুক এই প্রত্যাশায়।

author image

About Mehrab Habib

You Might Also Like...

Leave a Reply

Your email address will not be published.